জেনে নিন পৃথিবীর সেরা ১০ টি রঙিন শহরের কথা

0
1194

একটি শহরের সৌন্দর্যের পরিমাপক কিসে? এই প্রশ্নের উত্তর সাধারণত নির্ভর করে একটি শহরের ভূপ্রাকৃতিক দৃশ্য, স্থাপত্যশৈলী, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, শান্তিপূর্ণতা, জনসংখ্যা ইত্যাদির উপর। এগুলো ছাড়াও রঙের ব্যবহারও কোন শহরের ব্যতিক্রমধর্মী সৌন্দর্য বয়ে আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সারা পৃথিবী জুড়ে ছড়িয়ে আছে এমন কিছু শহর যাদের রঙের যাদুময়তা সকলকে মুগ্ধ করে। এই সব শহরের বাড়িঘর রঙ করার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু বৈশিষ্ট্য ও নিয়মাবলী রয়েছে, যা এই শহরগুলিকে পৃথিবীর অন্যান্য দেশের শহরের থেকে অনেকটাই আলাদা করেছে। এই সব শহরের সৌন্দর্য আপনাদের মুগ্ধ করবেই।

আসুন জেনে নেওয়া যাক পৃথিবীর সেরা ১০ টি রঙিন শহর সম্পর্কে-

১০. সেইন্ট জন’স, নিউফাউন্ডল্যান্ড, কানাডা

নিউফাউন্ডল্যান্ড প্রদেশে অবস্থিত সেইন্ট জন শহরটি কানাডার সবচেয়ে প্রাচীন শহর গুলোর একটি।এই শরের ইতিহাসের গোড়াপত্তন হয়েছিলো ১৪০০ সালের দিকে।ফান্ড উপসাগরের তীরে অবস্থিত সুন্দর এই শহরটির জনপ্রিয়তা মূলত শহরের কেন্দ্রস্থলে দাঁড়িয়ে থাকা সারি সারি রঙিন বাড়ির কারণে। চমৎকার স্থাপত্যকলায় শোভিত এই শহরটি পৃথিবীর সেরা রঙিন শহর গুলোর একটি। শহর জুড়ে ছড়িয়ে থাকা এসব বর্ণীল বাড়ি গুলোর কারণে শহরের সম্পূর্ণ একটা অংশের নামই হয়ে গিয়েছে ‘জেলিবীন রো’।

যদিও এই নামে সেখানে কোন রাস্তা নেই,তবু স্থানীয়রা শহরের এই অংশটি বোঝাতে এই নাম ব্যবহার করে। ‘জেলিবীন রো’ এর বর্ণময়তার পেছনে রয়েছে জাহাজের ক্যাপ্টেনদের অবদান। শোনা যায় যে,দুর সমুদ্র থেকে নিজের বাড়িটিকে যাতে সহজেই চিহ্নিত করে যায় তাই ক্যাপ্টেনরা যে কোন একটি ক্যান্ডি রঙে নিজেদের বাড়িটিকে রাঙিয়ে তুলত। আর এরই ফলাফল বহু বর্ণীল এই রঙিন শহর। এছাড়াও উজ্জ্বল রঙের ব্যবহারের ফলে কুয়াশাচ্ছন্ন পরিবেশেও বাড়ি গুলোর ঝলমলে রূপ অক্ষুণ্ণ থাকতো। এই শহরটি তাই পর্যটকদের নিকট খুবই জনপ্রিয়।

. লা বোকাবুয়েন্স আয়ার্সআর্জেন্টিনা

আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েন্স আয়ার্স এর দক্ষিণ-পূর্ব দিকে লা বোকা শহরটি অবস্থিত। শহরটির খ্যাতি রয়েছে এর উজ্জ্বল রঙে রাঙানো ঐতিহ্যবাহী কাঠের বাড়িঘর আর পথচারী বান্ধব রাস্তাঘাটের কারণে। এছাড়াও শহরটি জনপ্রিয় এর উন্মুক্ত জাদুঘর এর জন্য। শহর জুড়ে হরেক শিল্পীর বসবাস। বিভিন্ন শিল্পকলা প্রদর্শনীতে তারা রঙিন বাড়ি গুলোকে ব্যাকগ্রাউন্ড হিসেবে ব্যবহার করে থাকে। এছাড়াও পথে হাঁটতে হাঁটতেই দেখতে পাওয়া যাবে অনেক ম্যুরাল, গ্রাফিতি,ফটোগ্রাফ আর পেইন্টিং এর প্রদর্শনী।

. লংইয়ারব্যান, সালবার্ডনরওয়ে

নরওয়েজিয়ান দ্বীপপুঞ্জ সালবার্ড এর লংইয়ারব্যান শহরটি পৃথিবীর সর্ব উত্তরের জনসংখ্যা অধ্যুষিত শহর। সুমেরু বৃত্তে অবস্থিত শহরটির নামকরণ করা হয়েছে লংইয়ারব্যান নামক একজন আমেরিকান নাগরিকের নামানুসারে যিনি প্রথম এই অঞ্চলে আর্কটিক কয়লা কোম্পানি শুরু করেন। কাঠের তৈরি বহু বর্ণীল বাড়ির জন্য শহরটির পরিচিতি রয়েছে। উত্তর গোলার্ধে অবস্থিত হওয়ায় শহরটির ভূ-ভাগ প্রায় সারা বছরই তুষারাবৃত থাকে। স্যাঁতস্যাঁতে হওয়া থেকে রক্ষা করতে তাই বাড়ি গুলোকে মাটি থেকে কিছুটা উপরে কাঠের প্লাটফর্মের উপর তৈরি করা হয়। শহরটির মোট জনসংখ্যা ২০৪০ জন। কিন্তু শহর জুড়ে কোথাও নিরবচ্ছিন্ন সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা নেই।সারা বছর বরফে ঢাকা থাকায় লোকজন যাতায়াতের জন্য স্নো-স্কুটারই পছন্দ করে। নৈসর্গিক ভূপ্রকৃতির পাশাপাশি শহর জুড়ে রঙের ছোঁয়া যে কারো নজর কাড়বে।

. শেফশাওয়ান, মরক্কো

ছোট্ট সুন্দর শেফশাওয়ান শহরটি মরক্কোর উত্তর পশ্চিমে রিফ পর্বতে অবস্থিত। জনপ্রিয় এই পর্যটন শহরটির খ্যাতি রয়েছে এর নজরকাড়া নীল দালান আর রাস্তা-ঘাটের জন্য। ১৯৩০ সালের দিকে সর্ব প্রথম ইহুদিরা তাদের বাড়ি গুলোকে নীল রঙে রাঙানো শুরু করে। ইহুদিদের প্রাচীন ইতিহাস আর ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে এখনো পর্যন্ত তারা তাদের বাড়ি ঘর নীল রঙ করে রাখে। ইহুদি ধর্মে নীল রঙ আকাশ ও স্বর্গের প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।তাদের ধারণা এই নীল রঙ মানুষের আধ্যাত্মিক চেতনাকে জাগিয়ে তোলে।

নীলে নীলাম্বরি এই শহরটি দিনের বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রূপ ধারণ করে। আর্দ্র আবহাওয়ায় শেফশাওয়ানকে দেখলে মনে হয় যেন নীল জলের অথৈ সমুদ্র। ৪০,০০০ জনসংখ্যা অধ্যুষিত এই শহরের পরিবেশ ও অত্যন্ত শান্ত।

. বোক্যাপ, কেপটাউন, দক্ষিণ আফ্রিকা

ঐতিহাসিক এবং একই সাথে ঝলমলে এই শহরটি দক্ষিণ আফ্রিকার রাজধানী কেপটাউন এর সিগন্যাল পর্বতের পাদদেশে অবস্থিত। এই অঞ্চলটির মূল সৌন্দর্য এর উজ্জ্বল রঙ বিশিষ্ট বাড়িঘর আর পাথরের খোয়া বাঁধানো সংকীর্ণ রাস্তা। এখানকার বাড়ি গুলো জর্জিয়ান আর ওলন্দাজ স্থাপত্যশৈলীর মিশেলে তৈরি। বাড়িঘরের পাথরের এই শহরের ইতিহাসও খুব বর্ণীল। ১৬শ ও ১৭শ শতকে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ওলন্দাজরা অনেক দাস ক্রয় করে এই অঞ্চলে নিয়ে আসে। ক্রীতদাসরা এখানে কেপ মালয় নামে পরিচিত ছিলো। ১৭৬০ সালের দিকে এখানে অনেক বাড়ি তৈরি কারা হয় এবং তা ক্রীতদাসদের নিকট ভাড়া দেয়া হয়। পরবর্তীতে তারা এই বাড়ি গুলো কিনে নেয় এবং বিভিন্ন উজ্জ্বল রঙে রাঙিয়ে তোলে। রঙ হয়ে উঠে তাদের স্বাধীনতা প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম। এখানে অবস্থিত বো-ক্যাপ জাদুঘরটি শহরের সবচেয়ে পুরনো দালান যা এখনো মৌলিকতার সাথেই সংরক্ষিত আছে এবং বো-ক্যাপ ও কেপ মালয়দের ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রেখেছে।

. যোধপুর, রাজস্থান, ভারত

রাজস্থানের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর যোধপুর এর পরিচিতি ‘নীল শহর’ হিসেবে। শহরটির এই নামকরণের কারণ হচ্ছে শহর জুড়ে ছড়িয়ে থাকা নীল রঙের বাড়ি গুলো। পুরো শহর জুড়ে ১০০ এর বেশি এরকম বাড়ি রয়েছে। শোনা যায় যে, উচ্চ বর্ণের হিন্দু ব্রাহ্মণ পুরোহিতরা নিজেদের বাড়ি গুলো অন্যান্য লোকেদের বাড়ি থেকে আলাদা ভাবে চিহ্নিত করতে নিজেদের বাড়ি গুলো নীল রঙ করে ফেলে। পরে অন্যরাও এই পদ্ধতি অনুসরণ করা শুরু করে।

যোধপুর শহরটিকে ঘিরে আছে তপ্ত মরুভূমি। এই শহরের নীলচে আভা স্থানীয় বাসিন্দাদের মরুভূমির তপ্ততা থেকেও স্বস্তি দেয়। তাদের মতে, নীল রঙ মশা দূরে রাখে ও বাড়িঘর ঠাণ্ডা রাখে।

. উইলেমস্ট্যাড, কুরাস্যাও

উইলেমস্ট্যাড শহরটি কুরাস্যাও এর রাজধানী এবং ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ শহর। সমৃদ্ধ ইতিহাসের পাশাপাশি এই শহরের খ্যাতি রয়েছে রঙিন সরকারি ভবন সমূহ, শপিং মল, রেস্টুরেন্ট, বাণিজ্যিক ভবন আর ব্যক্তি মালিকানাধীন রঙিন ঘরবাড়ির জন্য। এই শহরটিতে সর্বমোট ৭৫০ টি রঙিন কাঠামো রয়েছে। রঙিন শহরটির সামনে স্বচ্ছ জলের উৎসটি শহরটিকে কাল্পনিকতার রূপ দান করেছে।

উইলেমস্ট্যাড এর রঙিন এই ঐতিহ্যের শুরু গভর্নর জেনারেল অ্যালবার্ট কিকার্ট এর হাত ধরে। শোনা যায় যে, নবম শতকে গভর্নর হিসেবে দায়িত্বে থাকা অবস্থায় তিনি প্রচণ্ড মাইগ্রেন এর ব্যথায় ভোগতে থাকেন। তিনি বুঝতে পারেন যে শহরের ধবধবে সাদা দালান গুলোতে সূর্যকিরণ প্রতিফলিত হয়ে তার এই সমস্যা তৈরি করছে। তাই তিনি আদেশ দিলেন যাতে নগর কেন্দ্রের সমস্ত দালান গুলো উজ্জ্বল রঙে রাঙিয়ে দেয়া হয়। সেই থেকে বদলে গিয়েছে শহরটির রূপ। শহরটির সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে প্রতি বছর হাজার হাজার পর্যটক এখানে বেড়াতে আসে।

. সান্তোরিনি, গ্রীস

সান্তোরিনি গ্রীসের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত একটি নয়নাভিরাম দ্বীপ। সান্তোরিনি দ্বীপে ১৫ টি ঐতিহ্যবাহী, ছবির মত সুন্দর গ্রাম রয়েছে। ধবধবে সাদা রঙের চমৎকার সব বাড়ি আর খোয়া বাঁধানো সংকীর্ণ রাস্তা এই গ্রাম গুলোর সৌন্দর্যের আধার। বাড়ি গুলোর বারান্দায় দাঁড়িয়েই উপভোগ করা যায় দ্বীপের আগ্নেয়গিরি আর সূর্যাস্তের অপরূপ সৌন্দর্য।

ধারণা করা হয় যে, ১৯শ শতকের দিকে স্থানীয় বাসিন্দারা তাদের বাড়ি গুলোতে চুনকাম করতে শুরু করে। এর কারণ হচ্ছে অন্যান্য রঙের চেয়ে চুনকাম করতে খরচ অনেক কম, দীর্ঘস্থায়ী আর এতে রয়েছে জারক পদার্থ যা সমুদ্রের লবণাক্ত বাতাস থেকে বাড়ি গুলোকে সুরক্ষা দেয়। ধীরে ধীরে এটা একটা ট্রেন্ড এ পরিণত হয় যা সান্তোরিনিকে একটা অদ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য দান করেছে।

. নীহ্যাভন (ড্যানিশঃনিয়্যহন), কোপেনহ্যাগেন, ডেনমার্ক

নীহ্যাভন ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহ্যাগেন এর একটি মনোরম পোতাশ্রয় এলাকা। জলপথের দুইপাশে চমৎকার সব রঙিন বাড়িঘর আর কাঠের তৈরি সারি বেঁধে নোঙর করা জাহাজ দেখতে ছবির মত লাগে। এই শহরের বাড়ি গুলো ১৭শ শতকের তৈরি। বেশিরভাগ বাড়ি গুলোকেই রেস্টুরেন্ট বা ক্যাফে তে পরিণত করা হয়েছে।

শহরের সবচেয়ে পুরনো বাড়ি হচ্ছে ৯ নম্বর বাড়িটি যাটা ১৬৬১ খ্রিস্টাব্দে তৈরি করা হয় এবং আজও তা মৌলিক রূপেই বিদ্যমান রয়েছে। নীহ্যাভন এর বেশির ভাগ বাড়িই ছিলো শিল্পীদের আবাসস্থল।

. ব্যুরানো, ইতালি

ব্যুরানো ইতালির একটি ছোট্ট সুন্দর শহর। এটি মূলত একটি দ্বীপপুঞ্জ যেখানে চারটি দ্বীপ রয়েছে এবং দ্বীপগুলো সেতু দ্বারা সংযুক্ত রয়েছে। সম্পূর্ণ শহর জুড়ে জলাশয়ের দুইপাশে রয়েছে সারি সারি বহু বর্ণীল বাড়িঘর। শহরটিকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা হালকা সবুজ রঙের জলে যখন বাড়ি গুলোর ছায়া পড়ে তা দেখলে মনে হয় যেন স্বর্গের সৌন্দর্য নেমে এসেছে এই শহরের বুকে।

এই শহরের বাসিন্দাদের আয়ের প্রধান উৎস হচ্ছে মাছ ধরা। শীতকালে ঘন কুয়াশার কারণে বাড়ি গুলোকে আলাদা করে চেনা যায়না। তাই জেলেরা নিজেদের বাড়ি গুলোকে বিভিন্ন উজ্জ্বল রঙে রাঙিয়ে রাখতো। বিশ্বাস করা হয় যে সেই থেকেই এই ঐতিহ্যের সূচনা হয়।

বর্তমানে এই শহরের বাড়ি গুলো রঙ করা হয় একটি নির্দিষ্ট পরিকল্পনা অনুযায়ী। ধরা যাক, কোন বাসিন্দা যদি তার বাড়ি রঙ করতে চায় তবে তাকে সরকারের অনুমতি নিতে হবে এবং তাদের দেয়া নির্দেশনা অনুযায়ী রঙ নির্বাচন করতে হবে। শহরের সৌন্দর্য যাতে অক্ষুণ্ণ থাকে তাই এই ব্যবস্থা।

Source – ইতিবৃত্ত