করো’না নিয়ে কিছু অজানা প্রশ্নের উত্তর দিলেন IISER (Kolkata)-এ কর্মরত সহকারী অধ‍্যাপক ডক্টর পার্থসারথী রায়

0
601

করো’না বিশ্বমহামারী আটকাতে WHO যে ক’জন বিজ্ঞানীর সঙ্গে কথা বলেছেন তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অফ সায়েন্স এডুকেশন এন্ড রিসার্চ (IISER, Kolkata)-এ কর্মরত সহকারী অধ‍্যাপক ডক্টর পার্থসারথী রায়। ডক্টর রায় IISC বেঙ্গালুরু থেকে মলিকিউলার ভাই’রোলজির উপর তার PhD করেন এবং বর্তমানে তিনি ক্যা’ন্সারের জিন নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কাজ করছেন। করো’না নিয়ে তার দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন দেখে নেওয়া যাক।

ভারত এই ভাই’রাসটির বৈশিষ্ট্য বুঝতেই পারেনি এবং সম্ভাব্য আক্রান্তদের পরীক্ষা করার দিক দিয়ে এখনও শতযোজন পিছিয়ে রয়েছে। এই একুশ দিনের লকডাউন পরিস্থিতি শুধুমাত্র চরম অজ্ঞানতার ফল। ‘The Week’ নামক অনলাইন পত্রিকায় দেওয়া তাঁর সাক্ষাৎকারটি এখানে রইলো।

প্রতীকী ছবি

প্রশ্ন – করো’না এলো কোথা থেকে? এই ব্যাপারে কিছু নিশ্চিত করে বলা যায় কি?

উত্তর – এটি একটি জুনোটিক ভাই’রাস। মানে প্রাণীদেহের ভাই’রাস। সংক্র’মণের উৎপত্তি চীনের উহান প্রদেশের বন্যপ্রাণী শরীর। কো’ভিড-১৯ জেনেটিক মিউটেশন করতে পারে। পরিবেশ পরিস্থিতি অনুযায়ী নিজেকে পালটে পালটে নেয়। তাই শুধুমাত্র একটি নয়, বিভিন্ন আলাদা আলাদা প্রজাতির প্রাণীদের সংক্র’মণের ক্ষমতা রাখে। এক্ষেত্রে ভাই’রাসটি এমন ভাবে নিজেকে পালটেছে যে, মানবদেহের নির্দিষ্ট কোষের প্রোটিনের সাথে আবদ্ধ হতে পারে। ফলে মানুষকে সংক্রমিত করতে পারছে।

প্রশ্ন – কোন কোন প্রাণী করো’না সংক্র’মন হতে পারে?

উত্তর – গবেষনা বলছে, মানব দেহে সংক্র’মণকারী ভাই’রাসের সঙ্গে বাদুড় সংক্রমণকারি ভাই’রাসের জিনগত মিল ৯৬%, আর প্যাংগোলিন সঙ্গে মিল ৯৯%। বলা যায় এই ভাই’রাস বাদুড় থেকে প্যাংগোলিন হয়ে মানুষের দেহে এসেছে। এরপর এই ভাই’রাস আর কাকে কাকে আক্র’মণ করবে সেটা জানতে আরও গবেষণা দরকার।

প্রতীকী ছবি

প্রশ্ন – WHO কেন এটাকে বিশ্ব-মহামারী বলছে?

উত্তর – কোনো একটি অসুখের মা’রণক্ষমতা এবং সংক্রা’মক ক্ষমতা দুটো আলাদা জিনিস। সাধারণত যে ভাই’রাসের মা’রণ ক্ষমতা অত্যন্ত বেশি সেই ভাই’রাস বিরাট একটা সংক্রা’মক হয় না, অপরপক্ষে যে ভাই’রাস অতিরিক্ত সংক্রা’মক তাতে আবার খুব বেশি মানুষ মা’রা যায় না। যেমন ২০০৩-এর সার্স ভাই’রাসে মৃ’ত্যুর হার অনেক বেশি ছিল। কিন্তু তাতে বেশি মানুষ সংক্রা’মিত হননি। উল্টোদিকে এই ভাই’রাস বিশ্বব্যাপী সকলকে সংক্রা’মিত করার ক্ষমতা রাখে।

প্রশ্ন – তাহলে আপনি বলতে চাইছেন, করো’না মা’রন ভাইরাস নয়?

উত্তর – একদমই না। কেবলমাত্র বয়স্ক মানুষ এবং আগে থেকে অন্য গুরুতর অসুখে ভোগা মানুষের জন্যই এ মৃ’ত্যু ডেকে আনতে পারে।

প্রশ্ন – WHO তো বলেছে আমাদের এই ভাই’রাসকে সঙ্গে নিয়ে বেঁচে থাকতে হবে!

উত্তর – একদমই তাই। আমরা কি আমাদের চারপাশে টিবি বা ইনফ্লু’য়েঞ্জা নিয়ে বেঁচে নেই? এ হল Attenuation process। হীনবল হতে হতে টিকে যাওয়া। যেসব মানুষ সংক্রা’মিত, তাদের মা’রা যাবার সঙ্গে সঙ্গে ভাই’রাসটাও মা’রা যায়। ফলে অন্যদের সংক্রা’মিত করার ক্ষমতাও আর থাকে না। তাই ভাই’রাসও সময় ও পরিস্থিতির সঙ্গে নিজের পরিবর্তন (মিউটেশন) করে টিকে থাকে কিছু কিছু জায়গায়। একে সর্বজনিক রোগ বলে। মাঝে মাঝে এটি আবার ফেটে পড়ার মতো বেশ খানিকটা ছড়ায়। তখন কম ইমিউন, খেতে না পাওয়া, অসুস্থ, অপুষ্টিতে ভোগা মানুষদেরই কেবল মারা পড়ার সম্ভাবনা থাকে। এই ভাই’রাস গুলোর মা’রণক্ষমতা কম কিন্তু ফিরে আসার ক্ষমতা প্রবল। আমার প্রশ্ন হল, মানুষ কেন আজও না খেতে পেয়ে অপুষ্টির জন্য মরবে? সরকারগুলি অপুষ্টি আটকাতে কী ব্যবস্থা নিচ্ছে?

প্রতীকী ছবি

প্রশ্ন – আচ্ছা আপনি কিভাবে WHO কে সাহায্য করেছেন?

উত্তর – ভাই’রাসটি উহানে যখন ছড়াতে শুরু করল, হু পৃথিবী জুড়ে বিজ্ঞানীদের সঙ্গে পরামর্শ করেছে। আমার সঙ্গেও কথা বলেছে।

প্রশ্ন – কী বুঝতে চাইছিল হু?

উত্তর – অসুখটার গতিপ্রকৃতি মূলত। কতগুলো রকম ফেরে নিজেকে ছড়াতে পারে; যদি মিউটেট করে তাহলে কেমন আকার নেবে; একে বলে জিনোটাইপ সংক্রান্ত বোঝাপড়া।

প্রশ্ন – জিনোটাইপ জানার দরকার পড়ে কেন?

উত্তর – গোটা পৃথিবীতে করো’নার টীকা আর ওষুধ তৈরি করার চেষ্টা চলছে। মুশকিল হল নির্দিষ্ট টীকা বা ওষুধ কেবল নির্দিষ্ট জিনোটাইপ এর ওপরেই কাজ করতে পারে, অন্যান্যদের ক্ষেত্রে নয়।

প্রশ্ন – কতগুলো CO’VID-19 জিনোটাইপ এখনো পাওয়া গেছে?

উত্তর – গোটা পৃথিবীতে মোট উনত্রিশটা। দুর্ভাগ্যবশত ভারতে আমরা মাত্র দুটো পেয়েছি বাকি জিনোটাইপগুলো খোঁজার চেষ্টাও হচ্ছে না ঠিকমতো। এখানে শুধু মানুষের মুখে লকডাউনের মতো মুখরোচক কথার ফুলঝুরি ছুটছে।

প্রতীকী ছবি

প্রশ্ন – এই দুটো জিনোটাইপ নিয়ে যদি একটু বলেন…

উত্তর – আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। যেখানে WHO সারা বিশ্বের একটা বড় অংশ থেকে নমুনা পরীক্ষা করে উনত্রিশটা করোনা ভাই’রাস জিনোটাইপ খুঁজে পেয়েছে, ভারতে আমরা মাত্র দুটো নমুনা থেকে দুটোই মাত্র জিনোটাইপ পেয়েছি। ভারতে এই ভাই’রাস সম্বন্ধে বোঝাপড়া এখনো সেভাবে কিছুই গড়ে ওঠেনি। ফলে এই সংক্রমণকে আটকানোর ব্যাপারেও একেবারে বিশবাঁও জলে পড়ে আছি আমরা।

প্রশ্ন – তাহলে কী মলিকিউলার বায়োলজিস্টরা এই লকডাউনকে সাপোর্ট করেন না?

উত্তর – আমি শুধু আমার কথাটাই বলতে পারি। আমার মতে এই লকডাউন পিরিয়ডকে কাজে লাগিয়ে যদি সংক্র’মণ খুঁজে পাওয়ার কোনো চেষ্টাই না করা হয়, যদি সম্ভাব্য আ’ক্রান্তদের পরীক্ষাই না করা হয় তাহলে কোনো লাভ নেই। আমরা কি তা করছি? না! আ’ক্রান্তদের বাড়িতেই আটকে রেখে দিচ্ছি, তাতে তাদের বাড়ির লোক আ’ক্রান্ত হচ্ছেন। যদি অসু’স্থতার লক্ষ্মণগুলো দেখা যায় তবেই হাসপাতালে যাচ্ছেন। কিন্তু ৬৫% লোকের তো কোনো রোগ-লক্ষণই দেখা দেবে না। লকডাউন শেষ হলে এই লোকগুলোই বয়স্ক এবং অন্যান্য রোগে ধুঁকতে থাকা মানুষদের সংক্রা’মিত করবে আর ভাই’রাসটি আবার মাথা চাড়া দেবে। ১৯১৮ সালে স্প্যানিশ ফ্লু মহা’মারিতে ঠিক এইভাবে দ্বিতীয় বারের সং’ক্রমণে সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা যায়।

প্রতীকী ছবি

প্রশ্ন – তাহলে সরকার কেন লকডাউন ঘোষণা করলো?

উত্তর – সেটা তো সরকারই জানেন। হয়তো খানিকটা ভয় থেকে আর খানিকটা টেস্ট এড়াবার জন্য। WHO বারবার জোর দিয়েছে যত বেশি সম্ভব টেস্ট করা যায় তার ওপর। ভারতের উচিত ছিলো এই রোগের ফাউন্ডার পপুলেশন (যারা প্রথম এই রোগকে এদেশে নিয়ে আসে) কে আলাদা করে আইসোলেশনে রাখা।

প্রশ্ন – তাহলে স্পেন, ইতালি আমেরিকা নিয়ে কী বলবেন?

উত্তর – না না ইতালি, আমেরিকা বা অন্যান্য ইউরোপীয় দেশগুলোর সাথে ভারতবর্ষকে এক করে ফেলবেন না। ওই দেশগুলোর বেশিরভাগই বয়স্ক মানুষ। ইতালির ৬৫℅লোক ষাটোর্ধ্ব। তাই মৃতের সংখ্যাও ওই দেশগুলোতে বেশি। এছাড়াও ইতালির বর্ণাঢ্য টুরিসম ব্যবসার ক্ষতি হবার কথা ভেবে ওরা বিদেশি টুরিস্টদের আটকায়নি।

প্রশ্ন – কিন্তু ওরাও তো এখন লকডাউন ঘোষনা করেছে–

উত্তর – সেটা টেস্টিং এর জন্য। ওরা সাময়িক লকডাউন করেছে সন্দিগ্ধ আক্রা’ন্তদের টেস্ট করার জন্য। আর হাসপাতাল, বেড ভেন্টিলেশন এই ব্যবস্থাগুলো ঠিকঠাক করে গড়ে তুলতে, স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য দরকারি সুযোগ সুবিধা দিতে। লকডাউন আসলে সেই গুরুত্বপূর্ণ সময়টুকু দেয় যাতে ঠিকঠাক টেস্টিং আর এই স্বাস্থ্যসেবার পরিকাঠামো গড়ে তোলা যায়।

প্রতীকী ছবি

প্রশ্ন – আপনার কি মনে হয় ভারত এগুলি কিছুই করেনি?

উত্তর – একদমই করেনি। ইতালি প্রতি দশ লক্ষে পাঁচ হাজার জনের টেস্ট করিয়েছে ভারত মাত্র আঠারো। যদি আমি টেস্ট না করাই, ঠিকঠাক স্বাস্থ্য পরিকাঠামো, আই সি ইউ-এর ব্যবস্থা না করি, স্বাস্থকর্মীদের বন্দোবস্ত না করি তাহলে লকডাউনের লাভটা কি?

প্রশ্ন – কিন্তু আমাদের হাতে তো প্রয়োজনীয় সংখ্যায় টেস্ট কিট নেই?

উত্তর – এটা কোনো অজুহাত হতে পারে না। আমাদের দেশে দশ হাজার এরকম ল্যাব আছে যেখানে টেস্টিং সম্ভব।

প্রশ্ন – এটা কীভাবে সম্ভব?

উত্তর – আ’ক্রান্ত হয়েছে এমন একজনের রক্তের নমুনা লাগবে আমাদের আর যাদের সম্ভাবনা আছে হবার তাদের রক্ত লাগবে। আমরা জিন মিলিয়ে দেখে নিতে পারব। এটা হাজার টাকা বা তারও কমে হতে পারে। ঘটনা চক্রে দু’সপ্তাহ আগেই আমরা IISER এ এই টেস্টটার খরচ হিসেব করছিলাম, যা দেখলাম তাতে মোটামুটি সাতশো টাকার কাছাকাছি লাগবে।

প্রতীকী ছবি

প্রশ্ন – কিন্তু এই টেস্ট কতটা ভরসাযোগ্য?

উত্তর – মার্কেটে যে ভুলভাল অনিশ্চিত কীট চলছে তার থেকে অনেক বেশি। আমি শুনে অবাক হলাম, সরকার টেস্ট প্রতি সাড়ে চার হাজার টাকা ঠিক করেছে। আর কিছু নির্দিষ্ট কোম্পানিকেই এর বরাত দেওয়া হয়েছে। ভেবে অবাক লাগে এই দুর্দিনেও কেমন কিছু লক্ষ-কোটিপতিদের পয়সা কামিয়ে নেবার সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে।

প্রশ্ন – আপনারা সরকারের দ্বারস্থ হয়েছেন?

উত্তর – সবচেয়ে দুর্ভাগ্যের বিষয় এটাই। আমাদের ল্যাব গুলো বিশ্বের অনেক দেশের ল্যাবের চেয়ে বেশি সমৃদ্ধ। এমনকি WHO আমাদের রিসার্চ এর ওপর ভরসা করে। কিন্তু আজ পর্যন্ত না কেন্দ্র না কোনো রাজ্য সরকার, কেউ আমাদের সাথে আলোচনা করেনি।

প্রশ্ন – কিন্তু ভারত তো WHO এর গাইডলাইনই ফলো করছে–

উত্তর – WHO বলেছে আইসোলেটেড রাখো এবং টেস্ট করো। কোথাও বলেনি লকডাউন করতে। ভারত লকডাউন করেছে কিন্তু টেস্টিং করছে না। যদি টেস্ট না করা হয় আমরা ভাই’রাসের আলাদা আলাদা ভ্যারাইটি আর আলাদা আলাদা মিউটেশনগুলোর কথা জানতেই পারব না।

সূত্র